+91 9330828434 +91 9804424251 banglalivenews@gmail.com

মনোজ মিত্রের স্মরণে

শঙ্কর জ্যোতি ঘোষ - March 23, 2025 1:07 pm - বিনোদন

মনোজ মিত্রের স্মরণে

মনোজ মিত্রের স্মরণে —–

জন্ম ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৩৮ —– মৃত্যু ১২ নভেম্বর ২০২৪ — প্রায় ৮৬ বছরের বর্ণময় জীবন যাপন করলেন মনোজ মিত্র।
১৯৩৮ সালে বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ধূলিহর গ্রামে তাঁর জন্ম।বাবা অশোকবাবু সার্কেল ইন্সপেক্টর ছিলেন। বদলির চাকরির জন্য তিন ছেলের কাউকেই স্কুলে ভর্তি করতে পারন নি।গৃহশিক্ষকরা তিন ভাইকেই পড়াতেন। কখনো পাবনার সিরাজগঞ্জ,কখনো টাঙ্গাইল,কখনো রাজশাহী…. নানান জায়গায় বালক মনোজ পরিবারের সঙ্গে কাটাচ্ছেন।নানান ধরনের গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠ নিচ্ছেন। সেইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা পরিণত বয়সে তাঁকে সৃষ্টিকর্মে খোরাক যুগিয়েছে।
একটু বড়ো হতে কিশোর বয়সে খুলনায় ঠাকুরদা – ঠাকুরমার কাছেই থেকে যান।সেইসময় বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে পুজোর সময় নাটক হলেও প্রথমদিকে ছোটোদের থাকার বিধান ছিল না।তবে নাটক বস্তুটির প্রতি নজর পড়ে সেই থেকে।সেখানে একবার রবীন্দ্রনাথের ” রোগের চিকিৎসা ” ছোটোদের দিয়ে করানো হয়।
১৯৫০ সালে তাঁর ১২বছর বয়সে ঠাকুরদা – ঠাকুরমা,অন্নদাচরণ- হেমনলিনী দেবী একরকম বাধ্য হয়ে দেশভাগের জ্বালা বুকে নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে বেলেঘাটায় এসে ওঠেন।তারপর বসিরহাট।মনোজ স্কুলে ভর্তি হলেন।স্কুলে, পাড়ায় নানা অনুষ্ঠানে ছোট ছোট নাটক করার মধ্যে দিয়ে কিশোর মনোজের নাটকের ওপর ভালোবাসা জন্মাচ্ছে।
স্কুলের গন্ডী পার হয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হলেন।সেইসময় ওখানে পড়ছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও কেয়া চক্রবর্তী। এনারা ছাড়াও অন্য দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয় যারা নাটক দেখা শুধু নয়, নাটক লিখতেও শিখেছেন।একজন অতনু সর্বাধিকারী, অন্যজন পার্থপ্রতীম চৌধুরী — এদের সহায়তায় ১৯৫৭ সালে উনিশ বছর বয়সে নাটকের দল তৈরি করলেন, নাম দিলেন “সুন্দরম”।
মনোজবাবু প্রথম জীবনে গল্প লিখে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠালেও পাত্তা পায় নি।বন্ধুরাও গল্পকার মনোজকে একরকম খারিজ করে দেয়। তাই ঠিক হলো অতনু ও পার্থ র নাটক নিয়ে “সুন্দরম” চলবে।
কিন্তু অতনুবাবুর জোরাজোরিতে একরকম জোর করেই এক রাতের মধ্যে লিখে ফেললেন ” মৃত্যুর চোখে জল”।যার গল্প কেউ পাতে ফেল ছিল না,তার লেখা প্রথম নাটকই রাজ্যস্তরে পুরষ্কার পেল,এমনকি “অল ইন্ডিয়া রেডিও” র প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো।এই বিষয়ে তিনি পরে বলেছেন, প্রত্যেকের আলাদা গল্প আছে, আমি বাবা,মা,দাদু,ঠাকুমা – দের গল্প নিয়ে নাটকটি লিখেছিলাম।তারপর নাট্যকার মনোজ মিত্র কে আর ফিরে তাকাতে হয় নি।”পরবাস”,”সাজানো বাগান “,” অলকানন্দার পুত্রকন্যা “…. একের পর এক নাটক তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়েছে।
এবার সিনেমায়।১৯৭৯ সাল নিউ আলিপুর কলেজে তিনি অধ্যাপনা করছেন।প্রখ্যাত সিনেমাকার তপন সিংহ মনোজবাবুর ” সাজানো বাগান “মঞ্চে দেখে পর্দায় করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে মনোজবাবুকে প্রস্তাব দিলেন নাটকের সঙ্গে নাট্যকারকেও চাই।মনোজবাবুর নাটক থেকে পর্দায় “বাঞ্ছারামের বাগান” এ রাজী হলেও নিজে সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি না থাকলেও তপনবাবুর অনড় মনোভাবে তিনি রাজি হলেন।
সত্যজিৎ রায়ের “ঘরে বাইরে “,’গণশত্রু” তে অভিনয় করেন।তাঁর মতো বাস্তব সম্মত অভিনয়ের মানুষ যখন পর্দায় এসেই গেছেন তখন অন্য সিনেমাকাররাও তাঁদের সিনেমায় কাস্ট করতে লাগলেন। তার মধ্যে অঞ্জন চৌধুরী র “শত্রু” ও তপন সিংহের “আদালত ও একটি মেয়ে ” তাঁর কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
“আদর্শ হিন্দু হোটেল ” টি ভি সিরিয়ালেও তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে।
মনোজ মিত্র নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন নাটকে ও সিনেমায়, নাটকের দল চালিয়েছেন,সেই সঙ্গে কলেজ – বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন — এই সমস্তকিছুর মধ্যে নিজের আদর্শ, বোধ ও বিশ্বাসকে ধরে রেখেছিলেন বলেই তাঁর সৃষ্টি আগামী দিনেও সমকালীন হয়ে থাকবে।

মনোজ মিত্র ৩৫ টি পূর্ণাঙ্গ নাটক,২৮ টি একাঙ্ক নাটক,২ টি ছোটোদের নাটক লিখেছেন।এই সব নাটকের চরিত্র তিনি চারপাশের মানুষদের মধ্যে থেকে তুলে নিয়েছিলেন।ফলে তারা কেবল কল্পনার চরিত্র হয়ে না থেকে বাস্তবের ধুলিমাখা মানুষ হয়ে মনোজবাবুর সৃষ্ট নাটকে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।”পরবাস”নাটকের “গজমাধব” আসলে ওপার বাংলা থেকে আসা তাঁদের বেলগাছিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ফণীবাবু।তিনি ঐ বাড়ির লোক হয়ে গিয়েছিলেন।”কিনু কাহারের থিয়েটার” এর কিনুকে মাটি খুঁড়ে কচ্ছপ বের করতে দেখেছেন মনোজবাবু।”চাক ভাঙা মধু”র জটা,মাতলা, বাদামি এইসব চরিত্র তাঁর দেখা, এদের দুঃখ, সুখ, আশা,রুচি,মানসিকতা — সব মনোজবাবুর চেনা জানা।আর মাটির কাছাকাছি থাকা এইসব মানুষদের নিয়ে সৃষ্ট নাটক আজও প্রাসঙ্গিক।”আমি জীবনটা যেভাবে দেখেছি, তেমনভাবে গল্প বলি নাটকে।তোমরা যেমন বোঝো,বুঝে নাও।আমি কিছু বোঝাতে চাই না”–নাট্যকার মনোজ মিত্র র সোজাসাপটা উত্তর। মহিষাদলের রাজবাড়ীতে শুটিংয়ে গিয়ে রাজবাড়ির ভেঙে পড়া রথ দেখে “শোভাযাত্রা” নাটক লিখে ফেললেন।
আবার যখন মহাকাব্য বা ইতিহাস নিয়ে নাটক লিখেছেন আমরা যেন তার মধ্যে সমকালের প্রতিফলন দেখি।”যা নেই ভারতে”, “ছায়ার প্রাসাদ”,” দেবী সর্পমস্তা” এই জাতীয় নাটক।
মনোজ মিত্র কে নিয়ে আরও অনেক আলোচনা করার কথা, আরো জানা বাকি রইল, আগামী দিনের জন্য।তবে নাট্যকার মনোজ মিত্র কে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন অভিনেতা কালী ব্যানার্জী।নাটকের সংলাপ ছোট করার পরামর্শ কালীবাবুই মনোজবাবুর মাথায় ঢুকিয়ে ছিলেন।তাঁর পরিষ্কার কথা সংলাপ যদি মহীরুহ হয়ে ওঠে তবে তার মাঝে ফোঁকর তৈরি হবে কি করে,আর যত ফোঁকর তৈরি হবে অভিনেতার প্রাণময়তা বা প্রাণহীনতা শ্রোতাদের কাছে তত ভালোভাবে পৌঁছাতে পারবে।মনোজবাবুর নাটকে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনে মনোজ মিত্র কে নিয়ে আরও জানবার,বোঝবার আকাঙ্খা রইলো।


আরও পড়ুন:

Follow Bangla Live on Facebook

Follow Bangla Live on YouTube