শতবর্ষের আলোকে বাদল সরকার
শতবর্ষের আলোকে বাদল সরকার
২০২৫ এ বাংলা নাট্য ও সিনেমার জগতের অনেকের জন্মশতবর্ষ। তাঁরা ১৯২৫ এ জন্মেছিলেন –তাঁদের মধ্যে ১৫ জুলাই কলকাতার ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীতলায় ছোট্ট নার্সিংহোমে মহেন্দ্রলাল ও সরলা সরকারের ছেলে সুধীন্দ্র র জন্ম হলো।সুধীন্দ্র নামটি কিন্তু নথিপত্রেই রয়ে গেলো।কারণ বৃষ্টি, আর জুলাই আগষ্ট তো বাংলায় ভরা বর্ষার সময়।শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় বৃষ্টি ও তেমন হয়েছিল,সেই দেখে সদ্যোজাত শিশুর কাকা বিপিনচন্দ্র প্রকৃতির সাথে সাজুয্য রেখে নাম রাখলেন বাদল।পরবর্তী জীবনে বাদল নামটি বাংলা তথা ভারতীয় নাট্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একটা স্থান করে নিয়েছে।
তবে বাদল সরকার কে নিয়ে কিছু বলার আগে ১৯২৫ সালে আরও যাঁরা বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতি জগতের দিকপাল জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের নামগুলি একটু দেখে নিই – ১) প্রদীপ কুমার(৪ জানু),২)মোহন রাকেশ(৮ জানু),৩)গুরু দত্ত(৯ জুলাই),৪)তৃপ্তি মিত্র(২৫ অক্টো),৫)ঋত্বিক ঘটক(২ নভে),৬)সলিল চৌধুরী(১৯ নভে),৭)বারীন সাহা(১৯২৫)।
বাদল সরকারকে থার্ড থিয়েটারের জনক বলা হয় যদিও তিনি মানতে চান নি।পেশায় ইঞ্জিনীয়ার বাদলবাবু বিদেশে পড়তে গেছেন, চাকরি করেছেন,কিন্তু নাটককে সবসময় ধরতে চেয়েছেন সমসময়ের মধ্যে দিয়ে। তিনি সমাজ, সংসার সম্মন্ধে মানুষজনের কাছে নিজের ভাবনাকে পৌঁছে দেবার জন্য তিনি প্রথাগত পথে তৃপ্ত হতে না পেরে অন্য ভাবে তাঁর ভাবনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন – অঙ্গনমঞ্চ নাটকের মধ্যে দিয়ে। থার্ড থিয়েটারের জন্ম হলো।
বাদল সরকার নাটকের মঞ্চে প্রধানত থাকলেও সিনেমার পর্দায় এসেছেন। তাঁর অভিনীত বা তাঁর লেখা নাটক নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র —
১) শনিবার (১৯৬৯) পরি.বারীন সাহা
২) কাল অভিরতি (১৯৮৯)পরি.অমিতাভ চক্রবর্তী,
৩)Calcutta, my EL DORADO(১৯৯০)পরি.মৃণাল সেন,
৪)পাখিরা(১৯৯০)পরি.শিবানন্দ মুখার্জি, অসীম চৌধুরী,দেবাশীষ চক্রবর্তী
৫)Third Theatre:A film on the Theatre of Badal Sarkar(১৯৯৫) পরি.অমশন কুমার
৬)Calcutta the undying city(১৯৯৮) পরি. অপর্ণা সেন।
৭)সারিরাত(২০১৫)পরি.অপর্ণা সেন
৮)বল্লভপুর কি রূপকথা(২০১৭) পরি.অখিলেশ জয়সোয়াল
৯)বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)পরি.অনির্বাণ ভট্টাচার্য
এবং দূরদর্শনের জন্যে সুমন মুখার্জি র পরিচালনায় Badal Sarkar :Theatre Director’s at work.
বাদল সরকারের কর্মময় ও একইসাথে সৃষ্টিশীল জীবনের গতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
১৯৬৯:প্রস্তাবিত নভী বোম্বাই নগরের নকশা করলেন।পোল্যান্ড,রাশিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়ায় যাত্রা। পোল্যান্ডে জার্কে গ্রাতটোস্কির সঙ্গে যোগাযোগ।
১৯৭১:চাকরি ছেড়ে দিলেন।জওহরলাল নেহেরু ফেলোশিপ পেলেন।
১৯৭২:১৮ই জুন এবিটিএ হলে” সাগিনা মাহাতো”দ্বিতীয় পর্যায় মঞ্চায়ন।নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্টবিভাগের প্রধান রিচার্ড শেখনারের আমন্ত্রণে আমেরিকায়।অঙ্গনমঞ্চের সূচনা একাডেমির তিন তলায়। “পদ্মশ্রী “সম্মান।
১৯৭৪:২০শে জুলাই, কার্জন পার্কে হামলা,আহত বহু নাট্যকর্মী নিহত প্রবীর দত্ত। ২৪ জুলাই কার্জন পার্ক অবরোধ, ধর্মতলায়” মিছিল ” প্রযোজনা। “মিছিল” এর প্রতি সংহতি জানালেন সারা ভারতের কবি,লেখক, নাট্যকর্মীরা। সভাপতি কায়ফি আজমি।কলকাতায় “মিছিল ” প্রযোজনায় শাবানা আজমি ও কেয়া চক্রবর্তী।
১৯৭৫:জরুরি অবস্থা। একাদেমির তিনতলায় ভাড়া বৃদ্ধি। শুরু হল একাদেমি প্রাঙ্গণে “মিছিল” অভিনয়।
১৯৩৩: ক্যালকাটা অ্যাকাডেমি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে শিক্ষারম্ভ।পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠগ্রহণ।
১৯৩৭:স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি।১৯৪১ পর্যন্ত পাঠগ্রহণ।এই সময়কালেই জীবনের প্রথম নাটকের বই পড়া।বইয়ের নাম eight modern plays.
১৯৪১ — ১৯৪৩ স্কটিশ চার্চ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পর্ব।বিষয় ছিল গণিত, জীবন বিঞ্জান, ভৌত বিজ্ঞান ও রসায়ন। বিঞ্জানের ছাত্রটি পঠনপাঠনের পাশাপাশি রামমোহন লাইব্রেরি এবং কলেজের গ্রন্থাগার থেকে দেশ বিদেশের গল্প উপন্যাস এবং নাটক পাঠে মগ্ন।
১৯৪৩:তৎকালীন বি.ই.কলেজ এখনকার আই,আই,ই,এস,টি,তে ভর্তি। এই কালপর্বে মেজদির বন্ধু সুকুমারী ভট্টাচার্যের কাছে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ।প্রথম নাটক “আগুন “রচনা।
১৯৪৭:বি,ই,ডিগ্রি লাভ।খাপড়খেদায়, নাগপুর থেকে ৩২ কিমি দূরে চাকরি। চাকরি ছেড়ে কলকাতায় এসে ক্যালকাটা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে সহ অধ্যাপক পদে যোগদান।
১৯৪৮-৪৯ :কম্যুনিষ্ট পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী। গৃহত্যাগ।এই কালপর্বেই পুতুল দেবীকে বিবাহ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপনা।
১৯৫০:বি,ই,কলেজে টাউন প্ল্যানিং এ মাষ্টার ডিপ্লোমা অর্জন।
১৯৫২:যাদবপুর পলিটেকনিকে শিক্ষকতা শুরু।
১৯৫৩:মাইথনে ডি,ভি,সি র asst.Engineer.
১৯৫৫-৫৬:কলকাতা কর্পোরেশনে সার্ভে বিভাগের Deputy Chief Valuer & Surveyor পদে যোগ।
১৯৫৭-৫৯:ইউরোপ ভ্রমণ।টাউন প্ল্যানিং এ উচ্চতর পাঠ।কিংস্টন এ চাকরি।
১৯৬০:বিদেশে অধ্যাপনা ও চাকরি ছেড়ে কলকাতা কর্পোরেশনে যোগ। ১১/০৯/১৯৬০ – চক্র নাট্যদলের প্রযোজনা ” বড়পিসিমা”।
১৯৬৩:”এবং ইন্দ্রজিৎ ” রচনা।তার কথায় লেখা শুরু হয় ১৯৫৬-৫৭ নাগাদ। এই বছরেই প্যারিস গমন,উদ্দেশ্য টাউন প্ল্যানিং য়ে উচ্চতর পাঠ,পাশাপাশি Besoncon শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসী ভাষা শেখা।”সারারাতি”,”বল্লভপুরের রূপকথা” এবং “কবিকাহিনি”।
১৯৬৪:প্যারিসে চিত্রকলা চর্চার শুরু।xylophone বাজানো শেখা।” বিচিত্রানুষ্ঠান” রচনা।কর্মসূত্রে নাইজেরিয়া গমন।
১৯৬৫-৬৭:লেখা হলো “বাকি ইতিহাস”। নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ। প্যারিস হয়ে কলকাতায় এসে বহুরূপী নাট্যদলের সঙ্গে যোগাযোগ।
১৯৬৭:সমরেশ বসুর ” বিবর” এর নাট্যরূপ।নাইজেরিয়া – কলকাতা দৌড়ঝাঁপ।তারমধ্যে বহুরূপী র হয়ে “প্রলাপ ” নাটকের নির্দেশনা। শতাব্দী নাট্যদলের সৃষ্টি।
১৯৬৮:বারীন সাহার “শনিবার ” ছবিতে অভিনয়।টাউন প্ল্যানিং বিষয়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অনুদানলাভ।এই বছরে সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরষ্কার।
১৯৭৭-৭৯:ওয়ার্কশপ ফর এ থিয়েটার অফ সিনথেসিস অ্যাজ এ রুরাল আরবান লিংক–জহওরলাল নেহেরু গবেষণা প্রকল্পের বক্তৃতামালা।The Third Theatre বই প্রকাশিত। পরে প্রত্যাহার।
১৯৮১-৮২: মৌলানা আজাদ মেমোরিয়াল লেকচার” The Changing Language of Theatre “.কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে” দ্বিজেন্দ্র লাল রায় স্মারক বক্তৃতামালায়”
চারটি ভাষণ।
১৯৮৫:ইংল্যান্ডে বক্তৃতা ও কর্মশালা।মাদুরাই ও আমেদাবাদে কর্মশালা।
১৯৮৬: মার্চ থেকে শুরু গ্রাম পরিক্রমা। পুনরায় ইংল্যান্ড যাত্রা, বক্তৃতা ও কর্মশালা।
১৯৮৮:লাহোর ও করাচি তে কর্মশালা।
১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ — ১০০ র বেশি কলকারখানার গেটে নাট্যাভিনয়। বাংলাদেশের নাট্টশিক্ষাশিবির পরিচালন।লন্ডনে একাধিক বক্তৃতা ও কর্মশালা।
১৯৯২ এ বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক বিভাগের আমন্ত্রিত অধ্যাপক।দিল্লিতে শ্রীরাম মেমোরিয়াল লেকচার।
ইতিমধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ছাত্র।
২০০৪:ভয়ংকর লরি দূর্ঘটনা। অসুস্থ শরীরে অমল পালেকরের আহ্বানে পুনে যাত্রা। দেশ বিদেশর বিভিন্ন নাট্টব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে বাদল সরকার রঙ্গমহোৎসবে বিপুল সংবর্ধনা।
২০০৫-৬ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত অধ্যাপক। শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় তাঁর কোলাজের একাধিক প্রদর্শনী।
২০০৮:নতুন করে শেক্সপিয়ার চর্চা। রবীন্দ্রনাথের লেখালেখির কাছেও প্রত্যাবর্তন।
২০০৯:ভাবা এটমিক রিসার্চ সেন্টারের ফেলোশিপ।মহীন্দ্র এ্যান্ড মহীন্দ্র থিয়েটারের এক্সেলেন্স লাইফটাইম এ্যাচিভমেন্ট পুরষ্কারের প্রথম প্রাপক।সেই অর্থে জমি কিনে শান্তিনিকেতনে নাট্টকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।থাইল্যান্ড ও লাওস এ নাট্ট প্রশিক্ষণ শিবির ও বক্তৃতামালা।
২০১০:কেরল রাজ্য সঙ্গীত নাটক একাডেমি র জীবনকৃতি সম্মান।
২০১১:মার্চে শতাব্দীর নাট্যউৎসব চলাকালীন অসুস্থতা। ১৩ই মে সন্ধ্যা য় প্রয়াণ।